বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন
শিরোনাম :
শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে আন্তজেলা গরু ডাকাত চক্রের ৩ সদস্য গ্রেপ্তার চাঁপাইনবাবগঞ্জে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেশব্যাপী বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন রূপগঞ্জে ৫০০ রোগীর মুখে হাসি, বিনামূল্যে চক্ষু ও ডায়াবেটিস সেবা নাচোল থানায় বৃক্ষ রোপণ করেন–পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস  গোমস্তাপুরে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন ও প্রজেক্টরে প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদর্শন​ কওমি মাদরাসা নিয়ে অপপ্রচারের প্রতিবাদ, নিরপেক্ষ তদন্তে সত্য উদঘাটনের আহ্বান সৈয়দ শিব্বির আহমদ ( শিবলী)  সৈয়দ মাহদী আলিয়া মাদ্রাসায় মেধাবীদের মাঝে নগদ বৃত্তি বিতরণ চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাসব্যাপী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প মেলা শুরু ​রূপগঞ্জে বিনামূল্যে চক্ষু ও ডায়াবেটিস সেবা পেলেন ৫০০ রোগী স্কুল শিক্ষক মাসুদ রানার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ

নওগাঁর তিন গ্রাম এখন ‘পানের রাজ্য’ সবুজ বরজে বদলে গেছে জীবনের গল্প

  • প্রকাশিত: রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১০৩ বার পড়া হয়েছে
199

নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি শামীম আনসারী:

নওগাঁ সদর উপজেলা থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার দূরে কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের প্রকৃতি-নিবিড় তিনটি গ্রাম জালম, মাগুড়া ও জাগেশ্বর। দূর থেকে এগোতেই চোখে পড়ে অগণিত সবুজের স্তর, কাছে যেতেই বোঝা যায় এ যেন সবুজের ভেতরে আরেক সবুজের রাজ্য। সারি সারি পানের বরজে মোড়ানো এই জনপদ এখন স্থানীয়দের কাছে ‘পানের গ্রাম’ হিসেবেই সুপরিচিত। সব মিলিয়ে, জালম, মাগুড়া ও জাগেশ্বর এখন শুধু তিনটি গ্রাম নয় এগুলো এক একটি বদলে যাওয়ার গল্প, স্বপ্ন দেখার গল্প। পানের সবুজ পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে পরিশ্রম, সংগ্রাম আর সাফল্যের এক অনন্য কাব্য। এই কাব্যই আজ নওগাঁর গ্রামবাংলাকে নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছে সম্ভাবনার এক উজ্জ্বল দিগন্ত হিসেবে।

প্রায় আড়াই হাজার মানুষের বসবাস এই তিন গ্রামে। একসময় যাদের জীবনের প্রধান অবলম্বন ছিল ধান চাষ, সেই কৃষকেরাই আজ পানের বরজকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন নতুন অর্থনীতির ভিত। বাড়ির আঙিনা, ফাঁকা জমি কিংবা বিস্তীর্ণ কৃষিজমি যেদিকে চোখ যায়, সেখানেই পানের সবুজ পাতার ছায়াঘেরা বরজ। যেন প্রতিটি বরজ কৃষকের স্বপ্ন, শ্রম আর প্রত্যাশার এক একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই এলাকার মাটি ও আবহাওয়া পানের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। উঁচু, বন্যামুক্ত বেলে দোআঁশ জমি এবং নিয়ন্ত্রিত সেচব্যবস্থা পানের গাছকে সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করে। পান চাষে প্রয়োজন হয় নিখুঁত পরিকল্পনা আগাছামুক্ত জমি, নির্দিষ্ট দূরত্বে নালা তৈরি, পানি নিষ্কাশনের সঠিক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিচর্যা। কৃষকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা আর কৃষি বিভাগের পরামর্শ মিলিয়ে তৈরি করেছেন এক কার্যকর চাষ পদ্ধতি।

কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, গত প্রায় ১৫ বছরে ধীরে ধীরে এই অঞ্চলে পানের চাষ বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে তিনটি গ্রামের প্রায় ৩০০ জন কৃষক ৭০০টিরও বেশি বরজে পান উৎপাদন করছেন। বাংলা, মিঠা, সাচি, কর্পূরী, গ্যাচ, নাতিয়াবাসুত, উজানী ও মাঘিসহ বিভিন্ন জাতের পান এখানে চাষ হচ্ছে, যা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় চাহিদা তৈরি করেছে।

মাগুড়া গ্রামের কৃষক অরূপ কুমার মণ্ডল ও বিকাশ চন্দ্র মণ্ডল জানান, গত তিন-চার বছরে পান চাষে নতুন করে আগ্রহ বেড়েছে। “ধানের তুলনায় পান চাষে লাভ বেশি, আর সারা বছরই ফলন পাওয়া যায়” বলছিলেন তারা। তাদের মতে, এই চাষ এখন শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং আর্থিক স্বচ্ছলতার নির্ভরযোগ্য পথ।

জালম গ্রামের অভিজ্ঞ পান চাষি বিধান চন্দ্র প্রায় ১৫ বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে ৫ বিঘা জমিতে তার পানের বরজ। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করতে হয়। বাঁশ দিয়ে তৈরি কাঠামো, সেচব্যবস্থা, বিভিন্ন সার ও কীটনাশক এবং শ্রমিক খরচ সব মিলিয়ে প্রাথমিক ব্যয় কিছুটা বেশি হলেও, নিয়মিত উৎপাদনের কারণে তা লাভে পরিণত হয়।

তার ভাষায়, একটি বরজ ৫ থেকে ৬ বছর পর্যন্ত ভালো থাকে। প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুইবার পান সংগ্রহ করা যায়। গড়ে প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২ পোয়া (৪ হাজারের বেশি পাতা) পান পাওয়া যায়। বর্তমান বাজারে বড় পান প্রতি পোয়া ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা, মাঝারি ১,৫০০ থেকে ২,৫০০ টাকা এবং ছোট পান ৫০০ থেকে ১,৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে—যা কৃষকদের জন্য যথেষ্ট লাভজনক।

জাগেশ্বর গ্রামের কৃষক সুনিল চন্দ্র প্রামাণিকের সফলতার গল্প আরও অনুপ্রেরণাদায়ক। ৭ বিঘা জমিতে তার পানের আবাদ। তিনি জানান, প্রতি বিঘা জমি থেকে মৌসুমে দেড় থেকে দুই লাখ টাকার পান বিক্রি করা সম্ভব। সপ্তাহে অন্তত দুইবার পাতা সংগ্রহ করা হয়, যা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে জয়পুরহাট, দিনাজপুর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। অনেক পাইকার সরাসরি গ্রামেই এসে পান কিনে নিয়ে যান।

তবে এই সফলতার পথ পুরোপুরি মসৃণ নয়। বর্ষা মৌসুমে ‘দলাপচা’ রোগের আক্রমণ পানের জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ। তবে কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ প্রয়োগ করলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব বলে জানান কৃষকেরা।

কির্ত্তিপুর ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা জিল্লুর রহমান বলেন, নওগাঁ জেলায় বাণিজ্যিকভাবে পান চাষ মূলত এই তিনটি গ্রামেই সীমাবদ্ধ। তবে এখানকার সাফল্য অন্য এলাকাকেও উৎসাহিত করছে। তিনি আরও জানান, সারা বছরই পান উৎপাদন সম্ভব হওয়ায় এটি একটি টেকসই কৃষি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।

নওগাঁ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মণ্ডল বলেন, চলতি মৌসুমে জেলায় ৪৩ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে, যাতে উৎপাদন আরও বাড়ে এবং কৃষকেরা অধিক লাভবান হন।

আরো সংবাদ পড়ুন
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
Theme Customized By BreakingNews