
নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি: শামীম আনসারী
সম্প্রতি বেসরকারি একটি সংবাদ ভিত্তিক টেলিভিশনে ‘বাবা নেই, মা কারাগারে অসহায় তিন শিশুর জীবন থমকে গেছে’ শিরোনামে সংবাদ প্রচার হয়। যেখানে আঁখি খাতুনকে অসহায় দেখিয়ে মাদক মামলায় অভিযুক্ত করে জেলে পাঠানো এবং তার অসহায় তিন সন্তান এখন চোখে অন্ধকার দেখছে। যা মানুষের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। তিন শিশুর এ মানবিক বিষয়টি সামনে আসায় নেটিজেনরা পুলিশ ও প্রশাসনকে দোষারোপ করে নানান মন্তব্য জুড়ে দিয়েছে। অনেকে বিষয়টি তদন্ত করে আঁখির মুক্তির দাবী করেছে। কিন্তু এ সংবাদের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে এক চিরসত্য।
থানায় মামলা সূত্রে জানা যায়- আঁখি খাতুনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৩ মে জি.আর (জেনারেল রেজিষ্ট্রার) মামলা নং-৫৯ , ২০২৪ সালের ৮ মার্চ জি.আর মামলা নং-৪০, ২০২২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি জি.আর মামলা নং-২৭ এবং ২০১৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর জি.আর নং- ১৮৩ মামলায় তিনি জেল হাজতে ছিলেন। ২০১৯ সালের জি.আর-৬৭ নম্বর মামলায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তাকে ৭টি মাদক মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ৪টি মামলায় জেল হাজতে ছিলেন আঁখি।
জানা যায়- নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পাঁচুপুর ইউনিয়নের সাহেবগঞ্জ মধ্যপাড়ার মৃত খাকছার আলীর ছেলে তোহা হোসেন প্রামাণিক(৩৮)। তার স্ত্রী আঁখি খাতুন (৩২)। দাম্পত্য জীবনে তাদের তিন সন্তান। বড় ছেলে তামিম এর বয়স ১৬ বছর, দ্বিতীয় ছেলে তানভীরের বয়স ১২ বছর এবং ছোট মেয়ে তোবা’র বয়স ৫ বছর। আঁখির বাবার বাড়ী রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার তাহেরপুর মুন্সিপাড়া এলাকায়। গত ১৬-১৭ বছর আগে তাদের বিয়ে হয়। তোহা হোসেনের পরিবার থেকে দাবী করা হয় তারা আগে থেকেই মাদকের (গাঁজা) ব্যবসার সাথে জড়িত। তার অন্যত্র বিয়ে হয়েছিল। বিষয়টি গোপন করে তোহার সাথে বিয়ে হয়। এ বিয়েতে তোহার বাবা খাকছার আলীর সম্মতি ছিলোনা।
বিয়ের পর আঁখি স্বামীর বাড়িতে এসে গাঁজা বিক্রি শুরু করে। বিয়ের পর মাদক সেবনের সাথে জড়িয়ে পড়েন তোহা হোসেন। সেবনের পাশাপাশি শুরু করেন ব্যবসা। এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে একটি বলয় গড়ে তুলেন। ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে। গাঁজা দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও পরবর্তীতে ইয়াবা ও হিরোইন এর ব্যবসা শুরু করেন। অতিরিক্ত মাদক সেবক করায় অসুস্থ হয়ে পড়েন তোহা।
গত ২ মাস আগে তোহা মারা যান। তার নামে থানায় ৩ টি মাদক মামলা রয়েছে। মাদকের ব্যবসা করে তিনতলা বাড়ি করেছেন। আঁখি’র নামে থানায় ৭টি মাদক মামলা রয়েছে। এরমধ্যে ৪টি মামলায় জেল খেটেছেন। এই তোহা ও আঁখি এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তাদের কারণে এলাকার অনেক যুবকের জীবন নষ্ট হওয়ার পথে। স্বামী মারা যাওয়ার পরও আঁখি দেদারছে মাদক ব্যবসা করছেন। মাদক ব্যবসা করেই অর্ধকোটি টাকার বাড়ি করেছে। বাড়িতে বয়স্ক শাশুড়িসহ অনেক আত্মীয়স্বজন আছে।
গত ২৬ এপ্রিল দুপুরে আঁখির বাড়িতে অভিযান পরিচালনা করে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর ও আত্রাই উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। অভিযানের সময় ৩জনকে মাদকসেবনরত অবস্থায় এবং আঁখিকে ৪ গ্রাম হিরোইন সহ আটক করা হয়। এরপর ভ্রাম্যমান আদালতে তাদের প্রত্যেককে ৩ মাসের জেল ও ৫০ টাকা করে জরিমানা করা হয়। তারপর থেকে আঁখি জেলখানায় রয়েছে। তার আটকের পর থেকে এলাকার মানুষ স্বস্থিতে রয়েছে।
এলাকাবাসীরা জানান- প্রতিদিন তাদের বাড়িতে শতাধিক মাদক সেবনকারীরা মাদক কেনার জন্য নিয়মিত যাতায়াত ছিল। বিভিন্ন সময় মাদক সেবনকারীরা আসা-যাওয়া করায় এলাকাবাসীরাও বিরক্ত। তবে ভয়ে প্রতেবিশীরা কিছু বলতে পারতো না। বিভিন্ন ভাবে প্রতিবেশীদের মামলা দেওয়ার ভয়ভীতি দেখানো হতো।
মৃত তোহা হোসেনের সৎভাই সুমন রেজা বলেন- ছোট ভাইয়ের শশুর বাড়ির পরিবারের সদস্যরা আগে থেকেই মাদকের (গাঁজা) ব্যবসার সাথে জড়িত। আগেও অন্য একজনের সাথে আঁখির বিয়ে হয়েছিল। আমরা কেউ তা জানতাম না। গত ১৬-১৭ বছর আগে আঁখিকে বিয়ে করার পর থেকে ছোট ভাইয়ের জীবন নষ্ট হতে থাকে। অবশেষে অসুস্থ হয়ে ২ মাস আগে ভাই মারাই গেল। ওই মেয়ের পাল্লায় পড়ে মাদক সেবন থেকে ব্যবসা শুরু করে। তিন সন্তানই তার মায়ের সাথে কয়েকবার জেল হাজতে গেছে। তার সন্তানদের নওগাঁ শহরের কোথায় রেখেছে আমাদের জানানো হয়না। তার কারণে এলাকার অনেক যুবক নষ্ট হয়ে গেছে।
প্রতিবেশী মাকসুদা খাতুন ও শরিফা বলেন- তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে মাদক ব্যবসা করতো। তাদের কারণে অনেক ছেলের জীবন নষ্ট হওয়ার পথে। এসব বিষয় নিয়ে আমরা এলাকায় অনেকবার সালিস করেছি। তাকে বোঝানো হয়েছে মাদক ব্যবসা না করার জন্য। তাকে নিয়ন্ত্রন করা যায়না। কিন্তু কে শুনে কার কথা। তার এক কথা প্রশাসন ম্যানেজ করে মাদক ব্যবসা করছে। প্রশাসন এসে তার বাড়িতে অভিযান দেয়। মাদক পাওয়ায় তাকে ভ্রাম্যমান দিয়ে জেল দিয়েছে। আঁখি জেলে যাওয়ায় আমরা এলাকাবাসী শান্তিতে আছি। আমাদের দাবী তাকে ৬মাস না, ৬ বছর জেল দেওয়া হোক।
প্রতিবেশী বয়জেষ্ঠ্য নজরুল ইসলাম বলেন- ওই পরিবারটি এলাকায় চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। মাদক ব্যবসা করেই ছোট্ট একটা ঘর থেকে ৫তলা ফাউন্ডেশনের বাড়ি দিয়েছে। ইতোমধ্যে চারতলা হয়ে গেছে। গ্রামের মধ্যে এখন তারা বিত্তশালী পরিবার। আঁখি অনেক বার জেল খেটেছে। জেল থেকে বেরিয়ে এসে আবার মাদকের ব্যবসা করে। আমরা এলাকাবাসীরা বাচ্চাদের মানুষ করা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
স্থানীয় ৪ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার আব্দুল হাকিম বলেন- মাদকের বিষয় নিয়ে তাদের নিষেধ করা সহ অনেকবার স্থানীয় ভাবে সালিস-বৈঠক করা হয়েছে। তাদের কোন ভাবে সংশোধন করা যায়না। স্বামী-স্ত্রী ব্যবসা করে, আবার এলাকার ছোট বাচ্চাদের সাথে নেয়। এছাড়া তারা অনেক সময় মাদকেসেবীরদের কাছে যেতে পারে না। এ সময় স্থানীয় ছোট বাচ্চাদের কিছু টাকা দিয়ে ক্রেতাদের কাছে মাদক পাঠায়। বাচ্চাদেরও তারা নষ্ট করা শুরু করেছে। মাদকের ব্যবসা করেই তারা বিত্তশালী হয়েছে।
আত্রাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল করিম বলেন- তার স্বামী তোহা হোসেন মারা গেছেন। তার বিরুদ্ধে ৩টি মাদকের মামলা রয়েছে। এলাকাবাসীরা অনেক ভাবে তাদের মাদক থেকে দুরে রাখার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন- আঁখি খাতুন তার এলাকায় কম আসা-যাওয়া করতো। তবে নওগাঁ জেলা সহ বিভিন্ন স্থানে বসবাস করতো এবং তার মাদক ব্যবসা পরিচালনা করতো। যখন সে এলাকায় আসে আমরা অভিযান চালিয়ে আটক করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। তার বিরুদ্ধে থানায় মাদকের ৭টি মামলা রয়েছে।#