নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি: শামীম আনসারী
নওগাঁ সদর উপজেলার বলিহার বাজারে মোবাইল চুরির অপবাদ দিয়ে মিঠু কর্মকার (২২) নামে এক যুবককে দফায় দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে বেসরকারি সংস্থা ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস) এর শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানীর বিরুদ্ধে। শনিবার (২৫ এপ্রিল) দুপুরে বলিহার ইউনিয়নের বলিহার বাজারে মারধরের ঘটনা ঘটে। মিঠু কর্মকার বলিহার বাজারের মৃত রঘুনাথের ছেলে। বাবা-মা না থাকায় এতিম ও অসহায় বলে পরিচিত।
স্থানীয় ও ঠেঙ্গামারা অফিস সূত্রে জানা যায়- বলিহার বাজারে হালদার মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘের অফিস। এ অফিসে কর্মকর্তা-কর্মচারি সহ ১০ জন জনবল আছে। গত শনিবার সকাল সাড়ে ৮ টার দিকে শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানী অফিসে গিয়ে মোবাইল (রেডমি-১০সি) চার্জে দিয়ে বেরিয়ে যান। এরপর ৯ টা ২০ মিনিটের দিকে অফিসের কর্মচারী কামরুল ইসলাম বেরিয়ে যান। তবে মেঘনা (বুয়া/খালা) অফিসেই ছিলেন। এরপর বেলা ১১টার দিকে শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানী অফিসে ফিরে আসেন। এ সময়ের মধ্যে অনেকেই অফিসে আসা-যাওয়া করে। তিনি অফিসে ফিরে এসে দেখেন মোবাইল চার্জে নাই। এরপর তিনি খুঁজাখুজি করেন। পরে অফিসে সামনের একটি দোকানে সিসিটিভি ফুটেজে দেখেন মিঠু অফিসের নিচ দিয়ে ঘাড়ে একটি বস্তা নিয়ে চলে যাচ্ছে।
সেদিনই মিঠু অফিসে নিচে ও আশপাশে প্লাস্টিক কুড়ানোর কাজ করছিল। পরে সে সরস্বতিপুর বাজারে চলে যায়। এরপর শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানী সহ অফিসের কয়েকজন ওই বাজারে গিয়ে তাকে ধরে মারধর করে। এরপর বলিহার বাজারে নিয়ে এসেও তাকে লাঠি দিয়ে কয়েকদফা মারধর করা হয়। পরে স্থানীয়দের নিয়ে সালিস বসে এবং কোন সমাধান হয়নি।
পরে ভীমপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই প্রণয় এসে তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যান। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে পরদিন রোববার ১৫১ ধারায় আদালত পাঠানো হয়। এলাকাবাসীরা তাকে জামিনে বের করে নওগাঁ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দুইদিন চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি নিয়ে যায়। প্রতিবেশীদের বাড়িতে মিঠু যন্ত্রনায় শুয়ে শুয়ে কাতরাচ্ছে। ঠিকমতো হাটাচলাও করতে পারছে না। ঘটনার পর থেকে এলাকাবাসীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে। দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসার দাবী জানানো হয়।
স্থানীয় সুজয়, সেলিম ও নকুল সহ অনেকে বলেন- মিঠু একজন এতিম ও অসহায় ছেলে। তার বিরুদ্ধে চুরির কোন ঘটনা এলাকায় নাই। তবে সে টোকাই হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন নষ্ট জিনিসপত্র ও বোতল-প্লাস্টিক কুড়িয়ে বিক্রি করে জীবন চলে। এলাকাবাসীরা তাকে সহযোগীতা করা হয়। তার থাকার জায়গা না থাকায় কৃষি অফিসের পরিত্যক্ত একটি ভবনে থাকে। বাজারে অবস্থিত ঠেঙ্গামারা শাখা ব্যবস্থাপকের মোবাইল হারানোকে কেন্দ্র করে তাকে ধরে নিয়ে এসে কয়েক দফা মারধর করে। স্ট্যাম দিয়ে তাকে হাঁটুতে পিটিয়ে স্ট্যামও ভেঙে ফেলা হয়। মোবাইল চুরির যে অপবাদ দেওয়া হয়েছে তার কাছ থেকে তা পাওয়া যায়নি। একটা এতিম ছেলেকে এভাবে মারধর করা ঠিক হয়নি। এ অন্যায়ের ব্যবস্থা হওয়া দরকার।
ভুক্তভোগী যুবক মিঠু কর্মকার বলেন- আমি ভাঙাচোরা জিনিসপত্র (বোতল-প্লাস্টিক) কুড়িয়ে জীবনযাপন করি। প্লাস্টিক কুড়িয়ে সেদিন সরস্বতিপুর বাজারে গিয়েছিলাম। সেখানে ঠেঙ্গামারা এনজি‘র লোকজন আমাকে চোর অপবাদ দিয়ে চরথাপ্পর দিয়ে ধরে নিয়ে আসে। এরপর বলিহার বাজারে লাঠিসোটা দিয়ে মারধর করে। পরে আবার ক্লাবে নিয়েও মারধর করা হয়। সেদিন কয়েক দফা আমাকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। ঠেঙ্গামারা অফিসে আমি যায়নি, কিন্তু তারপরও আমাকে মোবাইল চুরির অপবাদ দেওয়া হয়েছে। আমিতো নিরপরাধ। চুরির অপবাদ দিয়ে যে নির্যাতন করা হয়েছে আমি এর বিচার দাবী করছি।
ঠেঙ্গামারা মহিলা সবুজ সংঘ (টিএমএসএস) এর বলিহার শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম রব্বানী বলেন, প্রতিদিনের মতো অফিসে এসে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ফোনটি চার্জে দিয়ে মাঠে চলে যায়। পরে ১১ টার দিকে অফিসে এসে ফোনটি পাওয়া যায়নি। অফিসের সামনের একটি দোকানের সিসিটিভি ফুটেজে মিঠুকে অফিসের নিচ দিয়ে হেঁটে যেতে দেখা যায়। মোবাইলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ছিলো। যার কারণে দ্রুত মোবাইলটি উদ্ধারের জন্য বিভিন্ন স্থানে তাকে খোঁজাখুজি করা হয়। এরপর তাকে সরস্বতিপুর বাজার থেকে ধরে নিয়ে আসা হয়। তবে তাকে মারধর করা হয়নি। তবে অফিসের কাউকে ফোনটি হারানো বিষয়ে সন্দেহ করেননি বলে জানান তিনি।
নওগাঁ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন- চোর সন্দেহে এক যুবককে (মিঠু) আটক করার সংবাদ পেয়ে ভীমপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ এসআই প্রণয় ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয় জনগণের কাছ থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। পরে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে আদালতে সোপর্দ করে। যেহেতু সে এলাকায় টোকাই হিসেবে কাজ করে জীবিকা চালাতো। সন্দেহ ছিল সে মোবাইল চুরি করে থাকতে পারে। তবে তার কাছ থেকে মোবাইল উদ্ধার হয়নি। যদি কেউ তাকে অন্যায় ভাবে আঘাত করে থাকে এ বিষয়ে আইনগত সহায়তা চাইলে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা প্রদান করা হবে।#