মোঃ শাহ কবির ভোলাহাট (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) প্রতিনিধি
আমের রাজধানীখ্যাত চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমে বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা থাকলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন আমচাষি ও ব্যবসায়ীরা। বাজারে আমের দাম কম থাকলেও পরিবহন, প্যাকেজিং ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের পরিবর্তে লোকসানের শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি ক্যারেট আমের ক্রয়মূল্য প্রায় ৩০০ টাকা। অথচ একটি ক্যারেটের মূল্যই প্রায় ৩৫০ টাকা। এর সঙ্গে সাইড খরচ ৩০ টাকা, সুতা ও পলিথিন ৩০ টাকা, গাড়িতে তোলার খরচ ২০ টাকা, পরিবহন ভাড়া ২০০ টাকা, কুলি খরচ ২০ টাকা এবং গন্তব্য স্টেশন থেকে ক্রেতার বাসা পর্যন্ত পৌঁছাতে আরও ৩০ থেকে ৫০ টাকা ব্যয় হয়। সব মিলিয়ে আমের প্রকৃত মূল্যের তুলনায় খরচের পরিমাণই বেশি হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে ঢাকা, যশোর, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী ও বরগুনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম সরবরাহ করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত পরিবহন ও প্যাকেজিং ব্যয়ের কারণে ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে আম বিক্রি করেও খরচ ওঠানো কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে জেলার বিভিন্ন এলাকায় আম অবিক্রিত অবস্থায় পড়ে থাকার ঘটনাও ঘটছে।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের দাবি, আমের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে পরিবহন ব্যয় কমানো, বাজার ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা জরুরি।
এ বিষয়ে ভোলাহাট আম ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ মুনসুর আলী বলেন, “আমের রাজধানীখ্যাত এই জেলার হাজারো আমচাষি ও ব্যবসায়ী বর্তমানে আর্থিক ক্ষতির মুখে রয়েছেন। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে তাদের ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।”
ভোলাহাট উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কৃষিবিদ মোঃ সুলতান আলী বলেন, “২০২৫-২৬ অর্থবছরে ভোলাহাট উপজেলায় ৩ হাজার ৬১২ হেক্টর জমিতে প্রায় ৪২ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে অনুকূল ফলনের কারণে এ বছর প্রায় ৫৫ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে দেশের প্রায় সব জেলাতেই আমের চাষ হচ্ছে। ফলে বাজারে আমের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দাম কমে গেছে। একদিকে প্রতিকূল আবহাওয়ার সঙ্গে লড়াই করে উৎপাদন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত মূল্য না পাওয়ায় কয়েক বছর ধরেই অনেক চাষি লাভবান হতে পারছেন না। এ সমস্যা সমাধানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কাজ করছে। নিরাপদ ও মানসম্মত আম উৎপাদনের পাশাপাশি আম থেকে পাল্প, জুস, জ্যাম, জেলি, আচার ও ড্রাই ম্যাংগো উৎপাদন বাড়ানো গেলে চাষিরা উপকৃত হবেন। সরকার এ বিষয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে আমকে লাভজনক বাণিজ্যিক খাতে পরিণত করতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসতে হবে।”
গ্রামবাংলার বহুল প্রচলিত প্রবাদ—“ডুলির দামে বউ বিক্রি”—এবার যেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম ব্যবসার বাস্তব চিত্র হয়ে উঠেছে। কারণ আমের দামের চেয়ে খরচের বোঝাই এখন বেশি ভারী হয়ে দাঁড়িয়েছে চাষি ও ব্যবসায়ীদের কাঁধে।
০১৯৯৬৭৯৬৫৪৩